মডার্ন কালিনারি আর্ট: কৌশল নয়, চিন্তার পরিবর্তন!

অনেকে মনে করেন, মডার্ন কালিনারি আর্ট মানেই ফোম, জেল আর স্ফেরিফিকেশন। আসলে কিন্তু তা নয়। পুরোটা পড়লে বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে যাবে।


যেদিন বিভ্রান্তিটা ভাঙল:

আন্তর্জাতিক রান্নাঘরে কাজ করার শুরুর দিকে একটা বিষয় আমাকে বেশ অবাক করত। কিছু খাবার দেখতে খুব সাধারণ  প্লেটে হয়তো একটা মাছ, সামান্য সবজি, একটা সস, আর দু-একটা ছোট উপাদান। মনে হতো, এত সাধারণ একটা খাবারকে আবার আধুনিক বলা হচ্ছে কেন? আবার অন্যদিকে দেখতাম ফোম, জেল, ধোঁয়া, গোল গোল তরল বল, অদ্ভুত আকৃতির খাবার। স্বাভাবিকভাবেই মনে হতো, এগুলোই বুঝি আধুনিক রান্নার আসল পরিচয়।

রান্নাঘরে কাজ করতে করতে ধীরে ধীরে বুঝলাম, আমি আসলে তখনও আধুনিক রান্নার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টাই বুঝিনি।

একদিন একটা সাধারণ মাছ নিয়ে কাজ করার সময় বিষয়টা আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল। মাছটা খুব দামি কোনো উপকরণ ছিল না। কিন্তু শেফ মাছটা হাতে নিয়ে সরাসরি রান্না শুরু করলেন না। প্রথমে গন্ধ দেখলেন, গঠন দেখলেন, ত্বক দেখলেন, মাংস কতটা শক্ত বা নরম বুঝলেন। তারপর ঠিক করলেন কী ধরনের সস মানাবে, কোন তাপমাত্রায় রান্না করলে স্বাভাবিক স্বাদ সবচেয়ে ভালো থাকবে, আর কীভাবে ত্বক মচমচে করা যাবে। রান্নার পর প্লেটে খুব বেশি কিছু যোগ করা হলো না। কিন্তু খেয়ে বুঝলাম খাবারটা দেখতে সাধারণ হলেও প্রতিটা সিদ্ধান্তের পেছনে চিন্তা আছে।

সেদিনই বুঝেছিলাম  মডার্ন কালিনারি আর্টের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন প্লেটে দেখা যায় না, শেফের চিন্তার মধ্যে দেখা যায়।

কৌশল থাকলেই আধুনিক হয় না:

আমরা অনেক সময় মডার্ন কালিনারি বলতে শুধু ফোম, জেল, স্ফেরিফিকেশন, ধোঁয়া, তরল নাইট্রোজেন কিংবা অদ্ভুত আকৃতির খাবার বুঝি। এগুলো আধুনিক রান্নার কৌশলের অংশ হতে পারে, কিন্তু এগুলো ব্যবহার করলেই একটা খাবার আধুনিক হয়ে যায় না। প্লেটে ফোম আছে বলেই সেটা ভালো খাবার নয়। জেল আছে বলেই সেটা উন্নত রান্না নয়। স্ফেরিফিকেশন করা হয়েছে বলেই শেফের দক্ষতা প্রমাণ হয় না।

প্রযুক্তি তখনই মূল্যবান, যখন সেটা খাবারকে সত্যিকার অর্থে ভালো করে।

কোনো শেফ যদি শুধু দেখানোর জন্য ফোম ব্যবহার করেন, আর সেটা স্বাদে কোনো পরিবর্তন না আনে, তাহলে তার দরকার কী? একটা জেল যদি শুধু প্লেটের সৌন্দর্য বাড়ায় কিন্তু স্বাদ বা গঠনে কোনো ভূমিকা না রাখে, তাহলে সেটা সেখানে কেন থাকবে? প্রতিটা সিদ্ধান্তের পেছনে একটা কারণ থাকা উচিত।

এখানেই তফাত মডার্ন কালিনারি আর্ট, আর শুধু "আধুনিক দেখতে খাবার"-এর মধ্যে।

আধুনিক শেফ প্রথমে প্রশ্ন করেন, খাবারটা কীভাবে আরও ভালো করা যায়। তারপর ঠিক করেন কোন কৌশল ব্যবহার করবেন। উল্টোটা নয়। নতুন একটা কৌশল শিখে সেটা জোর করে খাবারের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া আধুনিক রান্না নয়।

ধরুন একটা দেশি মাছ রান্না করছেন। ফোম দিতে পারেন, জেল দিতে পারেন, আধুনিক আকৃতিতে সাজাতে পারেন  কিন্তু তার আগে জানতে হবে মাছটার নিজস্ব স্বাদ কী, তার সঙ্গে কোন স্বাদ ভালো যায়, কতটা অম্লতা লাগবে, কতটা চর্বি লাগবে, কী রকম গঠন দরকার, আর অতিথি প্রথম কামড়ে কী অনুভব করবেন। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা থাকলে আপনি আধুনিক রান্নার পথে আছেন। শুধু প্লেটটা দেখতে আধুনিক করার চেষ্টা করলে, হয়তো একটা সুন্দর ছবি তৈরি হবে  উন্নত খাবার নয়।

উপকরণকে নতুন চোখে দেখা:

আধুনিক রান্নার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটা হলো উপকরণকে নতুন চোখে দেখা।

একটা আলু শুধু আলু নয়। কাঁচা অবস্থায় গঠন একরকম, সেদ্ধ করলে অন্যরকম, ভাজলে অন্যরকম, রোস্ট করলে আরেকরকম। একটা পেঁয়াজ কাঁচা অবস্থায় ঝাঁঝালো, ধীরে রান্না করলে মিষ্টি, পুড়িয়ে দিলে সম্পূর্ণ অন্য সুগন্ধ তৈরি করে। একটা টমেটো কাঁচা, রোস্ট করা আর শুকিয়ে নেওয়া তিনটাই সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস।

আধুনিক শেফ শুধু বলেন না, "এটা দিয়ে কী রান্না করব?" তিনি প্রশ্ন করেন, "এই উপকরণটা আর কী কী হতে পারে?"  আর এখান থেকেই গবেষণা শুরু হয়।

একটা উপকরণ কোন মৌসুমে সবচেয়ে ভালো, কোথা থেকে এসেছে, কতটা সতেজ, কীভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে, তার কোন অংশ ব্যবহার হচ্ছে আর কোন অংশ ফেলে দেওয়া হচ্ছে এসবও একজন আধুনিক শেফের চিন্তার অংশ। মাছের মাথা কি শুধু ফেলে দেওয়ার জিনিস, নাকি তা দিয়ে ভালো স্টক হয়? সবজির খোসা দিয়ে কি অন্য কিছু বানানো যায় না? যখন একজন শেফ একটা উপকরণের পুরো সম্ভাবনা দেখতে শুরু করেন, তার রান্নাও বদলাতে শুরু করে।

পুরোনো জ্ঞান, নতুন ব্যবহার:

মডার্ন কালিনারি মানে পুরোনো রান্নাকে ভুলে যাওয়া নয় বরং পুরোনো জ্ঞানকে নতুনভাবে ব্যবহার করা। স্টক, সস কমিয়ে ঘন করা, সংরক্ষণ, আচার, ধোঁয়ায় রান্না, ধীরে রান্না, শুকিয়ে সংরক্ষণ, ফারমেন্টেশন এসব কৌশলের অনেকগুলোই বহু পুরোনো, কিন্তু আধুনিক শেফ এগুলোকে আরও নিখুঁতভাবে ব্যবহার করতে পারেন। পুরোনো একটা খাবারকে নতুনভাবে পরিবেশন করা মানেই তার পরিচয় নষ্ট করা নয়। কখনো কখনো আধুনিক কালিনারির সবচেয়ে সুন্দর কাজ হলো পুরোনো খাবারের আসল সৌন্দর্যকে আরও পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা।

বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ:

এই জায়গাতেই বাংলাদেশের জন্য বিশাল সুযোগ লুকিয়ে আছে।

আমাদের রান্নাঘরে এমন অসংখ্য উপকরণ আছে যা আমরা প্রতিদিন ব্যবহার করি, কিন্তু তার সম্ভাবনা নিয়ে খুব কম গবেষণা করি শুঁটকি, সরিষা, কাঁচামরিচ, তেঁতুল, নারকেল, দেশি মাছ, বিভিন্ন শাক, কাঁচা কলা, খেজুরের গুড়, আঞ্চলিক মসলা, ভর্তা, আচার। এগুলোকে আমরা শুধু ঐতিহ্যবাহী খাবার হিসেবে দেখি। কিন্তু একজন আধুনিক শেফ যদি এগুলোকে নতুনভাবে দেখতে শুরু করেন, গল্পটা বদলে যেতে পারে।

শুঁটকি শুধু শুঁটকি নয় তার গভীর স্বাদকে অন্য উপাদানের সঙ্গে কীভাবে মেলানো যায়, তা নিয়ে গবেষণা করা যায়। সরিষা শুধু ঝোলের মসলা নয় তার ঝাঁঝ, তেল আর সুগন্ধ নানাভাবে ব্যবহার করা যায়। তেঁতুল শুধু টক দেওয়ার উপকরণ নয় তার অম্লতা, মিষ্টতা আর ঘনত্ব নিয়ে কাজ করা যায়। দেশি মাছ শুধু ভাজা বা ঝোলে সীমাবদ্ধ নয় নিজস্ব স্বাদকে সম্মান রেখে নতুন কৌশলে তাকে নতুনভাবে উপস্থাপন করা যায়।

এটাই আমার মতে আধুনিক বাংলাদেশি রান্নার সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা। আমাদের বিদেশি খাবার নকল করার দরকার নেই। আমাদের বিশ্বের রান্নার কৌশল শিখতে হবে, কিন্তু সেই কৌশল ব্যবহার করতে হবে নিজেদের উপকরণ, নিজেদের ইতিহাস আর নিজেদের স্বাদের পরিচয় নিয়ে। একটা বিদেশি খাবার সুন্দরভাবে নকল করতে পারা আপনাকে দক্ষ শেফ প্রমাণ করতে পারে। কিন্তু নিজের দেশের একটা সাধারণ উপকরণকে এমনভাবে তুলে ধরা, যাতে একজন বিদেশি অতিথি খেয়ে নতুন কিছু আবিষ্কারের অনুভূতি পান সেটাই একজন শেফের নিজস্ব পরিচয় তৈরি করে।

শেফের মাথায় যে প্রশ্নগুলো চলে:

মডার্ন কালিনারি আর্ট তাই শুধু নতুন প্রযুক্তির গল্প নয়। এটা নির্ভুলতার গল্প, স্বাদের ভারসাম্যের গল্প, টেক্সচারের গল্প, উপকরণ বোঝার গল্প, গবেষণার গল্প, অপচয় কমানোর গল্প, উপস্থাপনার গল্প আর সবকিছুর ওপরে, একজন শেফের চিন্তার গল্প।

আধুনিক শেফ খাবার তৈরির সময় শুধু ভাবেন না, "এটা দেখতে কেমন হবে?" তিনি ভাবেন

  • প্রথম কামড়ে কী অনুভূতি হবে?
  • এরপর কোন স্বাদ আসবে?
  • টেক্সচার কীভাবে বদলাবে?
  • সস কি মূল উপকরণের স্বাদ ঢেকে দিচ্ছে, নাকি আরও পরিষ্কার করছে?
  • শেষ কামড়ের পর অতিথির মুখে কোন স্বাদ থেকে যাবে?

এই প্রশ্নগুলোই একটা খাবারকে সাধারণ রান্না থেকে উন্নত কালিনারি অভিজ্ঞতায় নিয়ে যায়।

নতুন শেফদের শুধু নতুন নতুন কৌশল শেখার পেছনে ছুটলে হবে না। ফোম, জেল বা স্ফেরিফিকেশন কীভাবে বানাতে হয় এগুলো শেখা যায়। কিন্তু তার আগে জানতে হবে, এগুলো কখন এবং কেন ব্যবহার করা উচিত। কারণ একটা কৌশল জানা, আর সেই কৌশল সঠিক জায়গায় প্রয়োগ করতে পারা এক জিনিস নয়।

একজন শেফের হাতে যত বেশি কৌশল থাকবে, তার স্বাধীনতা তত বেশি হবে। কিন্তু কোন কৌশল ব্যবহার করবেন, সেই সিদ্ধান্তের জন্য দরকার জ্ঞান, অভিজ্ঞতা আর বিচারবোধ। এই কারণেই বলি মডার্ন শেফ হওয়ার অর্থ আধুনিক সরঞ্জাম হাতে নেওয়া নয়, আধুনিকভাবে চিন্তা করতে শেখা।

আপনি যদি একটা সাধারণ আলু দিয়ে অসাধারণ কিছু তৈরি করতে পারেন আপনি আধুনিকভাবে চিন্তা করছেন। আপনি যদি একটা পুরোনো বাংলাদেশি খাবারের স্বাদ নষ্ট না করে নতুনভাবে উপস্থাপন করতে পারেন আপনি আধুনিকভাবে চিন্তা করছেন। আপনি যদি সবাই যে অংশ ফেলে দেয় তার নতুন ব্যবহার খুঁজে বের করতে পারেন আপনি আধুনিকভাবে চিন্তা করছেন। আর আপনি যদি শুধু খাবারটাকে দেখতে আধুনিক বানানোর চেষ্টা করেন প্লেট আধুনিক দেখাবে, কিন্তু চিন্তা তখনও আধুনিক হয়নি।

আন্তর্জাতিক রান্নাঘরের অভিজ্ঞতা থেকে সবচেয়ে বড় যে শিক্ষা পেয়েছি তা হলো একজন বড় শেফের পরিচয় প্লেটে থাকা ফোম, জেল বা কোনো বিশেষ কৌশল দিয়ে তৈরি হয় না। তার পরিচয় তৈরি হয় সে কীভাবে একটা উপকরণকে দেখে, কীভাবে একটা সমস্যার সমাধান করে, আর কীভাবে একটা খাবারের মাধ্যমে নিজের চিন্তা প্রকাশ করে তার মাধ্যমে।

মডার্ন কালিনারি আর্টের আসল পরিবর্তন তাই প্লেটে নয়। আসল পরিবর্তন শুরু হয় শেফের মাথায়। আর যখন শেফের চিন্তা বদলায়, তখন তার রান্নাও একদিন বদলে যায়।

Hashtag:

#ChefJahed #Culinary #Cooking #CulinaryArts #ChefLife #CookingCourse #Food #CulinaryCourse

Post a Comment

Previous Post Next Post