আমাদের প্রায় সবার রান্নাঘরেই একটা অভ্যাস দেখা যায় বাজার থেকে মাংস এনেই সরাসরি কলের নিচে ধরে ভালো করে ধুয়ে নেওয়া।
মনে হয়, এতে মাংসের রক্ত, ময়লা বা জীবাণু ধুয়ে যায় এবং খাবারটা "পরিষ্কার" হয়। কিন্তু খাদ্য বিজ্ঞানীরা ও পুষ্টিবিদরা বলছেন সম্পূর্ণ উল্টো কথা কাঁচা মাংস ধোয়া উচিত নয়। শুনতে অবাক লাগলেও, এর পেছনে যুক্তিসঙ্গত বৈজ্ঞানিক কারণ আছে।
কেন আমরা মাংস ধুয়ে থাকি:
মাংস ধোয়ার অভ্যাসটা মূলত এসেছে একটা স্বাভাবিক ধারণা থেকে চোখে দেখা যায় এমন রক্ত বা আঠালো ভাব দূর করলেই বুঝি জীবাণুও দূর হয়ে যায়। এছাড়া বাজারের মাংসে ধুলাবালি বা কাটার সময় লেগে থাকা ছোট হাড়ের গুঁড়ো পরিষ্কার করার একটা মানসিক তাগিদও কাজ করে।
কেন বিশেষজ্ঞরা মাংস ধুতে নিষেধ করেন:
১. জীবাণু পানিতে ধুয়ে যায় না, বরং ছড়িয়ে পড়েকাঁচা মুরগি বা মাংসে সালমোনেলা, ক্যাম্পাইলোব্যাক্টার-এর মতো ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে। এগুলো মাংসের গভীরে বা টিস্যুর সাথে এমনভাবে লেগে থাকে যে সাধারণ পানির ধারায় ধুলে সেগুলো মাংস থেকে সরে না। উল্টো, কল থেকে পানি পড়ার সময় জীবাণুযুক্ত পানির ছিটা সিঙ্ক, কলের হাতল, কাউন্টারটপ, এমনকি পাশে রাখা অন্য শাকসবজি বা থালাবাসনেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। একে বলা হয় "ক্রস-কনটামিনেশন" বা আন্তঃদূষণ।
২. রান্নার তাপই আসল জীবাণুনাশকমাংস সঠিক তাপমাত্রায় রান্না করলে তার মধ্যে থাকা প্রায় সব ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া মরে যায়। যেমন মুরগির মাংস কমপক্ষে ৭৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস (১৬৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট) পর্যন্ত ভালোভাবে সেদ্ধ বা রান্না করলে জীবাণু ধ্বংস হয়ে যায়। তাই ধোয়ার চেয়ে ভালোভাবে রান্না করাই প্রকৃত নিরাপত্তা।
৩. সিঙ্ক নিজেই দূষিত হয়ে যেতে পারেরান্নাঘরের সিঙ্ক এমনিতেই আর্দ্র পরিবেশ, যেখানে ব্যাকটেরিয়া সহজে বেঁচে থাকতে পারে। কাঁচা মাংস ধোয়ার পর যদি সিঙ্ক ভালোভাবে জীবাণুমুক্ত না করা হয়, তাহলে সেখানে পরে ধোয়া ফলমূল বা শাকসবজিও দূষিত হতে পারে।
তাহলে কী করা উচিত:
• মাংস প্যাকেট থেকে বের করে সরাসরি রান্নার পাত্রে বা কাটার বোর্ডে নিন, ধোয়ার দরকার নেই।
• মাংস কাটার জন্য আলাদা বোর্ড ও ছুরি ব্যবহার করুন, যা অন্য খাবারের জন্য ব্যবহার করবেন না।
• মাংস স্পর্শ করার আগে ও পরে সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধুয়ে নিন।
• মাংস রাখা প্যাকেট, কাটার বোর্ড ও কাউন্টারটপ ব্যবহারের পর গরম সাবান পানি দিয়ে পরিষ্কার করুন।
• মাংস পুরোপুরি রান্না হয়েছে কিনা তা নিশ্চিত করতে সম্ভব হলে মিট থার্মোমিটার ব্যবহার করুন।
ব্যতিক্রম কোথায়:
কিছু ক্ষেত্রে অবশ্য ভিন্ন নিয়ম প্রযোজ্য। যেমন লবণ বা ভিনেগার দিয়ে মাখানো মাংস বা মাছ থেকে অতিরিক্ত লবণ বা মশলা সরাতে হালকা ধুয়ে নেওয়া যেতে পারে, তবে এক্ষেত্রেও যতটা সম্ভব সাবধানে, কম ছিটিয়ে করা উচিত। আর গরুর নাড়িভুঁড়ি বা অন্ত্রের মতো অংশ, যেখানে চোখে দেখা যাওয়া ময়লা থাকে, সেগুলো পরিষ্কার করার প্রক্রিয়া ভিন্ন এবং তা সাধারণত রান্নার একটা অংশ হিসেবেই গণ্য করা হয়।
মাংস ধোয়া একটা পুরনো অভ্যাস, কিন্তু আধুনিক খাদ্য নিরাপত্তা বিজ্ঞান বলছে এতে উপকারের চেয়ে ঝুঁকি বেশি। জীবাণু দূর করার আসল উপায় হলো সঠিক তাপমাত্রায় রান্না এবং রান্নাঘরের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা পানির ধারা নয়। তাই পরের বার মাংস রান্নার আগে কল খোলার বদলে সরাসরি কড়াইয়ে বা হাঁড়িতে তুলে দিন, আর রান্নার পর হাত ও রান্নাঘর ভালোভাবে পরিষ্কার করে নিন।
Hashtag:
#ChefJahed #Cookingwithjahed #মাংসরান্না #খাদ্যনিরাপত্তা #রান্নাঘরটিপস #FoodSafety #MeatCookingTips #HealthyCooking #KitchenHygiene #CookingTips #বাংলারান্না
