আমাদের বই পিওর বাংলা কুইজিন নিয়ে। ঐ বই থেকে একটি লিখা শেয়ার করছি আজ...
সময়টা আজ থেকে প্রায় হাজার বছর আগে, একাদশ-দ্বাদশ শতাব্দীর কথা। তখনো বাংলা স্বাধীন, শাসন করছেন সেন বা পাল রাজারা।
তখনকার বিয়ের ভোজে কী খাওয়া হতো জানেন? এর চমৎকার একটি প্রমাণ পাওয়া যায় চতুর্দশ শতাব্দীর (১৩০০ শতক) প্রাচীন গ্রন্থ 'প্রাকৃত পৈঙ্গল'-এ। সেখানে একটি শ্লোকে আদর্শ বাঙালি খাবারের বর্ণনা দিয়ে বলা হয়েছে—
"ওগ্গর ভত্তা রম্ভঅ পত্তা, গাইক ঘিত্তা দুগ্ধ সজুক্তা..."
অর্থাৎ, কলাপাতা বা পদ্মপাতায় ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত, গাওয়া ঘি, মৌরলা মাছের ঝোল আর দুধ। প্রাচীন বাংলার কবিদের লেখায় বারবার এই সাদা ভাত, ডাল, বেগুন ভাজি আর তাজা রুই-কাতলা বা ইলিশ মাছের কথা উঠে এসেছে। তখন গ্রামের সাধারণ মানুষের বিয়েতে এগুলোর পাশাপাশি আলু বা নানা রকম সবজির পদই ছিল মূল আকর্ষণ। মাছকে উর্বরতার প্রতীক মনে করার যে চল, তা সেই হাজার বছর আগে থেকেই বাঙালির রক্তে মিশে আছে।
সুবেদার ইসলাম খান ও নবাব শায়েস্তা খানের ঢাকা আগমন হয় এরপর বাংলার ইতিহাসের মোড় ঘুরে যায় ১২০৪ সালে, যখন ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খলজীর হাত ধরে বাংলায় মুসলিম শাসনের সূচনা হয়। তবে বাংলার খাবারে সবচেয়ে বড় বিপ্লবটি ঘটেছিল মুঘলদের হাতে।
সালটি ১৬০৮। মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের নির্দেশে সুবেদার ইসলাম খান চিশতী যখন রাজমহল থেকে ঢাকায় রাজধানী স্থানান্তর করলেন, তিনি একা আসেননি। সাথে নিয়ে এসেছিলেন একদল নিপুণ পারসিয়ান ও উত্তর ভারতীয় বাবুর্চি। এই বাবুর্চিরাই বাংলার রান্নাঘরে প্রথম জাফরান, গোলাপজল, কেওড়া আর গরম মশলার জাদুকরী সুবাস ছড়িয়ে দেন।
পরবর্তীতে ১৬৬৪ সালের দিকে যখন নবাব শায়েস্তা খান বাংলার সুবেদার হন, তখন টাকায় আট মণ চাল পাওয়ার সুবাদে মানুষের ঘরে ঘরে উৎসবের আমেজ লেগে থাকতো। নবাবী দরবারের সেই পোলাও, গরুর মাংসের ভুনা, মুরগির রোস্ট আর জর্দা ধীরে ধীরে দরবারের দেয়াল টপকে ঢাকার আশপাশের জমিদারদের বাড়িতে পৌঁছায়। এবং সেখান থেকে গত কয়েক দশকে তা গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের বিয়ের অপরিহার্য মেন্যু হয়ে ওঠে।
বিয়ের ভোজে ঝাল আর মশলাদার খাবারের পর মিষ্টির পালা। তবে এই মিষ্টির ইতিহাসটা বেশ চমকপ্রদ!
১৫১৭ সালের দিকে পর্তুগিজ বণিকরা প্রথম বাংলায় পা রাখে। পরবর্তীতে ১৫৭৯-১৫৮০ সালের দিকে সম্রাট আকবরের অনুমতি নিয়ে তারা হুগলি ও চট্টগ্রামে বিশাল আস্তানা গড়ে তোলে। তখনকার বাঙালিরা দুধ ফাটানোকে 'পাপ' মনে করত। কিন্তু এই পর্তুগিজরাই বাংলার ময়রাদের প্রথম শেখাল কীভাবে দুধ ফাটিয়ে 'ছানা' তৈরি করতে হয়।
পর্তুগিজরা চলে যাওয়ার অনেক বছর পর, সেই ছানাকে কাজে লাগিয়েই ঘটল এক বিরাট জাদু। সালটা ১৮৬৮। কলকাতার বাগবাজারের বিখ্যাত ময়রা নবীন চন্দ্র দাস প্রথমবারের মতো ছানাকে চিনির শিরায় ফুটিয়ে তৈরি করলেন বাঙালির প্রাণের রসগোল্লা!
অন্যদিকে, টাঙ্গাইলের বিখ্যাত চমচমের ইতিহাসও খুব পুরোনো। ঊনবিংশ শতাব্দীর (১৮০০ শতকের) মাঝামাঝি সময়ে রাজা দশরথ গৌড় নামের একজন মিষ্টি কারিগর আসাম থেকে টাঙ্গাইলের পোড়াবাড়িতে আসেন। ধলেশ্বরী নদীর পানি আর গরুর খাঁটি দুধ দিয়ে তিনিই প্রথম তৈরি করেন এই পোড়াবাড়ির চমচম, যা আজ গ্রাম-বাংলার যেকোনো বিয়ের এক রাজকীয় মিষ্টান্ন।
১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের পর বাংলায় শুরু হয় ব্রিটিশ শাসন। এরপর প্রায় দুইশ বছরের শাসনামলে ইংরেজরা কেবল শাসনই করেনি, আমাদের বিয়ের খাবারের প্লেটেও রেখে গেছে এক দারুণ ছাপ!
আপনার মেন্যুর সবচেয়ে আকর্ষণীয় খাবারটির দিকে তাকান— 'মুরগির রোস্ট'। মজার ব্যাপার হলো, 'রোস্ট' (Roast) শব্দটি পুরোপুরি ইংরেজি! ব্রিটিশ সাহেবরা তাদের ডিনার টেবিলে আস্ত মুরগি বা পাখির শুকনো রোস্ট খেতে খুব পছন্দ করতেন। কিন্তু বাংলার স্থানীয় বাবুর্চিরা সেই সাহেবদের খাবারকে নিজেদের মতো করে নিলেন। তারা ব্রিটিশদের রোস্ট করার ধারণার সাথে মুঘলদের ঘি, পেঁয়াজ বেরেস্তা আর টকদই মিশিয়ে তৈরি করলেন এক নতুন ফিউশন— যা আজ আমাদের বিয়ের বাড়ির সেই মশলাদার ও রসালো 'মুরগির রোস্ট'।
আর আপনার তালিকার ১৫ নম্বর পদটি— সালাদ (শসা, গাজর, টমেটো, পেঁয়াজ)? প্রাচীন বাংলায় কাঁচা শাকসবজি এভাবে সালাদ হিসেবে খাওয়ার খুব একটা চল ছিল না। ব্রিটিশরাই মূলত এ দেশে ইউরোপীয় স্টাইলে গাজর, বিট, টমেটো, বাঁধাকপির মতো সবজির বাণিজ্যিক চাষ জনপ্রিয় করে এবং ভারী খাবারের সাথে ফ্রেশ সালাদ খাওয়ার সংস্কৃতি চালু করে। আজ পোলাও বা রোস্টের সাথে এক টুকরো লেবু আর সালাদ ছাড়া আমাদের যেন চলেই না!
পরে ফখরুদ্দিন মুন্সী থেকে আধুনিক ফিউশনের শুরু। বিংশ শতাব্দীতে এসে বিয়ের খাবারে আরও কিছু নাম চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। আপনি আধুনিক বিয়েতে যে বিরিয়ানি বা কাবাব দেখেন, তা সাধারণ মানুষের নাগালে আসার পেছনে কিছু মানুষের বড় অবদান আছে।
১৯৩৯ সালে পুরান ঢাকায় হাজী গোলাম হোসেন প্রথম বাণিজ্যিকভাবে 'হাজী বিরিয়ানি' বিক্রি শুরু করেন। এরপর ১৯৬০-এর দশকে হাজির হন আরেক কিংবদন্তি বাবুর্চি— ফখরুদ্দিন মুন্সী (ফখরুদ্দিন বিরিয়ানির প্রতিষ্ঠাতা)। তার অসাধারণ রান্নার হাত ধরেই মূলত 'কাচ্চি বিরিয়ানি' ঢাকার নবাব পরিবার থেকে সাধারণ মানুষের বিয়ের আসরে জনপ্রিয়তা পাওয়া শুরু করে।
এরপর আসে বিশ্বায়নের যুগ। ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে বাংলাদেশে চাইনিজ রেস্তোরাঁগুলোর ব্যাপক প্রসার ঘটে। মানুষের রুচিতে পরিবর্তন আসে। সেই পরিবর্তনের হাওয়াতেই একুশ শতকের গ্রামবাংলার বিয়েতেও এখন দেশি খাবারের পাশাপাশি জায়গা করে নিয়েছে ফ্রাইড রাইস, চিকেন ফ্রাই বা নান-রুটি।
ভাবতে অবাক লাগে, তাই না?
আজ গ্রামের একটি ছিমছাম বিয়ের আসরে বসে আপনি যখন পোলাও, রোস্ট আর চমচম খাচ্ছেন, তখন আপনার প্লেটটিতে অদৃশ্যভাবে জড়িয়ে আছে প্রাচীন বাংলার কোনো এক কবি, মুঘল সুবেদার ইসলাম খান, পর্তুগিজ নাবিক, ব্রিটিশ সাহেব, ময়রা নবীন চন্দ্র দাস আর বাবুর্চি ফখরুদ্দিন মুন্সীর অবদান। একটি বিয়ের খাবারের থালা যেন কালের পরিক্রমায় লেখা এক জীবন্ত ইতিহাসের বই!
