রন্ধনশিল্প নিয়ে আমাদের সমাজে অনেক কথা হয়, কিন্তু বাস্তবে বিষয়টা নিয়ে গভীর আলোচনা খুব কমই দেখা যায়।
আমরা সাধারণভাবে রান্নাকে রান্না বলেই শেষ করি, আর শিল্পকে আলাদা একটি জগত ভাবি। কিন্তু যখন বলা হয় “রন্ধন শিল্প”, তখন সেখানে শুধু খাবার বানানো নয়, জ্ঞান, কৌশল, নান্দনিকতা, বিজ্ঞান এবং উপস্থাপনার একটি পূর্ণ সমন্বয় থাকা উচিত। বাস্তবতা হলো, Bangladesh-এর টিভিতে যাদের আমরা প্রায়ই “রন্ধন শিল্পী” হিসেবে দেখি, তাদের অনেকের কাজ দেখলে প্রশ্ন উঠতেই পারে, তারা সত্যিই কি সেই মানের শিল্পী?একজন মানুষকে শিল্পী বলার আগে কয়েকটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার। শিল্পী মানে শুধু দক্ষ হাত নয়, সচেতন মস্তিষ্কও।
একজন প্রকৃত রন্ধনশিল্পীর প্রথমেই থাকা উচিত খাবারের মৌলিক জ্ঞান। কোন উপকরণ কীভাবে কাজ করে, কোন স্বাদ কোন স্বাদের সাথে মানায়, কোন রান্নার তাপমাত্রা কত হওয়া উচিত, কোন দেশের কোন কৌশল কোন খাবারে প্রয়োগ করা যায়, এসব জানা খুব জরুরি। শুধু রেসিপি মুখস্থ করে রান্না করা শিল্প নয়। সেটা অনেক সময় কারিগরি কাজ হতে পারে, কিন্তু শিল্প বলতে যা বোঝায়, তার জন্য গভীর বোঝাপড়া দরকার।
এখন প্রশ্ন আসে, টিভিতে যাদের দেখি তারা কি এই বিষয়গুলো জানেন? অনেক অনুষ্ঠান দেখলে মনে হয় না। রান্না শেষ হওয়ার পর প্লেটের দিকে তাকালেই বোঝা যায় উপস্থাপনার দিকে খুব কম মনোযোগ দেওয়া হয়েছে। অথচ আন্তর্জাতিক রন্ধনশিল্পে প্লেটিং একটি বড় বিষয়। খাবার পরিবেশন শুধু খাবার দেওয়া নয়, সেটি দর্শকের চোখে প্রথম অনুভূতি তৈরি করে।
ভালো প্লেটিং মানে রং,
ফাঁকা জায়গা,
উচ্চতা,
ব্যালান্স
এবং ফোকাল পয়েন্ট নিয়ে ভাবা। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় প্লেটে সবকিছু একসাথে ঢেলে দেওয়া হয়েছে, যেন তাড়াহুড়ো করে পরিবেশন করা হয়েছে। এখনো যদি মনে হয় শেফ জাহেদ সাথে তর্কে আসবেন। ওপনে চ্যালেন্জ চলে আসবেন।
এবার শুনি আরেকটি বড় সমস্যা হলো সসের ব্যবহার। অনেক অনুষ্ঠানে দেখা যায় সস শুধু প্লেটে ঢেলে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সেটি খাবারের সাথে মানাচ্ছে কি না, তা নিয়ে ভাবা হয়নি। সসের কাজ শুধু স্বাদ বাড়ানো নয়, খাবারের টেক্সচার ও ভারসাম্য তৈরি করা। সস ম্যাচিং না বুঝলে পুরো ডিশের মান কমে যায়। একজন প্রশিক্ষিত রন্ধনশিল্পী জানেন কোন সস হালকা হবে, কোনটা ঘন হবে, কোনটা অ্যাসিডিক হবে, আর কোনটা শুধু অ্যারোমা যোগ করবে।
গারনিশিং নিয়েও একই সমস্যা। অনেক সময় দেখা যায় গারনিশ শুধু সাজানোর জন্য ব্যবহার করা হয়েছে, কিন্তু সেটি খাবারের সাথে খাওয়া যায় কি না, সেটার গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। আসল গারনিশ এমন হওয়া উচিত যা দেখতে সুন্দর এবং খেতেও অর্থপূর্ণ। আন্তর্জাতিক কুলিনারি স্কুলগুলোতে শেখানো হয়, গারনিশ কখনোই অপ্রয়োজনীয় হওয়া উচিত নয়। কিন্তু আমাদের টিভি অনুষ্ঠানের অনেক গারনিশ দেখলে মনে হয় শুধু ক্যামেরার জন্য করা হয়েছে, খাবারের জন্য নয়।
আরেকটি বিষয় খুব স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে, সেটি হলো স্ট্যান্ডার্ডের অভাব। একজন প্রকৃত রন্ধনশিল্পী সবসময় একটি নির্দিষ্ট মান বজায় রাখেন। তার কাজ দেখলে বোঝা যায় তিনি পরিকল্পনা করে রান্না করছেন। কিন্তু টিভির অনেক অনুষ্ঠানে রান্না যেন তাৎক্ষণিক এবং এলোমেলো মনে হয়। এতে দর্শক ভুল ধারণা পায় যে রান্না মানে শুধু উপকরণ মিশিয়ে দিলেই হলো। অথচ বাস্তবে রন্ধনশিল্প অনেক বেশি শৃঙ্খলাপূর্ণ।
সমস্যার আরেকটি দিক হলো শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ। অনেক দেশে একজন শেফ বা রন্ধনশিল্পী হওয়ার আগে দীর্ঘ সময় প্রশিক্ষণ নিতে হয়। কিচেন হাইজিন, ফুড সায়েন্স, প্লেটিং, কিচেন ম্যানেজমেন্ট, এমনকি খাবারের ইতিহাস পর্যন্ত শেখানো হয়। কিন্তু এখানে অনেক সময় দেখা যায় জনপ্রিয়তা বা মিডিয়ার কারণে কাউকে “শিল্পী” বলা হচ্ছে, কিন্তু তার কাজ সেই পরিচয়ের সাথে পুরোপুরি মিলছে না।
টিভির একটি বড় প্রভাব আছে। মানুষ টিভি দেখে শিখে। তাই যারা টিভিতে রান্না দেখান, তাদের দায়িত্ব আরও বেশি। যদি তারা ভুল প্লেটিং দেখান, ভুল সস কম্বিনেশন দেখান, বা গারনিশিংয়ের সঠিক ধারণা না দেন, তাহলে নতুন প্রজন্মও সেটাই অনুসরণ করবে। এতে পুরো রন্ধন সংস্কৃতির মান ধীরে ধীরে নিচে নেমে যেতে পারে।
আরেকটি বিষয় হলো নান্দনিকতা। রন্ধনশিল্প মূলত একটি ভিজ্যুয়াল আর্টও। খাবার শুধু স্বাদের জন্য নয়, দেখার জন্যও তৈরি হয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অনেক শেফ একটি ডিশ ডিজাইন করতে সময় নেন, স্কেচ করেন, রং নিয়ে ভাবেন। কিন্তু আমাদের টিভির অনেক রান্না দেখলে মনে হয় এই ভাবনার জায়গাটা একেবারেই অনুপস্থিত।
সবকিছু মিলিয়ে প্রশ্নটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যাদের রন্ধনশিল্পী বলছি, তারা কি সত্যিই সেই মানের? না কি আমরা শব্দটা খুব সহজে ব্যবহার করছি? সমালোচনা করা খারাপ নয়, যদি সেটি উন্নতির জন্য হয়। রন্ধনশিল্পের মর্যাদা বাড়াতে হলে প্রথমে সত্যটা স্বীকার করতে হবে। যে জায়গায় ঘাটতি আছে, সেটি নিয়ে আলোচনা করতে হবে।
একজন প্রকৃত রন্ধনশিল্পীর পরিচয় শুধু রান্না নয়। তার কাজ দেখলে বোঝা যাবে.?
তিনি খাবারকে সম্মান করেন,
উপকরণকে বোঝেন,
প্লেটকে ক্যানভাস হিসেবে দেখেন।
তার ডিশে থাকবে চিন্তা, ভারসাম্য এবং সৌন্দর্য।
যতদিন পর্যন্ত এই মানসিকতা তৈরি না হবে, ততদিন শুধু টিভিতে দেখা গেলেই কাউকে রন্ধনশিল্পী বলা কঠিন। আমি কিছু ভুল লিখে যদি মনে হয় আমার ভুল ধরিয়ে দিন। ধন্যবাদ। শেফ জাহেদ।
